লকডাউনের ২১ দিন: প্রেক্ষাপট পুর্ব রাজাবাজার


লকডাউনের ২১ দিন: প্রেক্ষাপট পুর্ব রাজাবাজার

করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারে ২১ দিনের লকডাউন শেষ হয় ৩০ জুন মধ্যরাতে। ৯জুন মধ্যরাতে এখানে লকডাউন শুরু হয়। রাজাবাজারের বাসিন্দা হিসেবে এই ২১ দিন আমাদের কেমন কেটেছে? একজন সাধারণ নাগরিক ও সাংবাদিক হিসেবে লকডাউনের কিছু অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরছি।

১. লকডাউন চলাকালীন পূর্ব রাজাবাজারে প্রবেশের সবগুলো পথ বন্ধ করে দেয়া হয়। কোথাও লোহার গেটে তালা, কোথায় বাঁশ ও টিনের বেড়া। গ্রিন সুপার মার্কেট এবং আইবিএ হোস্টেলের পাশে একটিমাত্র প্রবেশপথ রাখা হয়। সেখানেও বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড দেয়া হয়। তবে ডাক্তার-নার্স-আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং সাংবাদিকরা তাদের পরিচয়পত্র দেখিয়ে এখান দিয়ে যাতায়াতের সুযোগ পেয়েছেন। প্রথম কয়েক দিন এন্ট্রি বা নিবন্ধন ছাড়া যাওয়া-আসার সুযোগ থাকলেও পরে প্রবেশমুখে স্বেচ্ছাসেবকরা খাতায় সবার নাম, বাসার নম্বর এবং মোবাইল নম্বর লিখে রাখতেন। অনেক সময় সাংবাদিকদের প্রেস কার্ড দেখলে তারা এন্ট্রি না করেই যাওয়া-আসার অনুমতি দিতেন। কয়েকদিন প্রবেশ ও বহির্গমনের সময় শরীরের তাপমাত্রা মাপার দৃশ্যও চোখে পড়েছে। প্রশ্ন হলো, যেসব পেশার মানুষ প্রতিদিন কর্মস্থলে গিয়েছেন এবং এসেছেন, তাদের এই যাওয়া-আসার পথে এবং কর্মস্থলে গিয়ে যে তারা আক্রান্ত হননি এবং এলাকায় এসে তারা যে অন্য কাউকে আক্রান্ত করেননি, তার নিশ্চয়তা কী?

২. এই চার পেশার মানুষের বাইরে অন্য আরও অনেকেই নানা অজুহাতে, ছুতোয়া-ছাতায় এলাকার বাইরে গিয়েছেন আবার ফিরে এসেছেন। ফলে তাদের মধ্যে কে কে আক্রান্ত হয়েছেন এবং অন্যকে সংক্রমিত করেছেন, তা জানার উপায় নেই।

৩. লকডাউন চলাকালীন ওষুধের দোকান ছাড়া অন্য সব ধরনের দোকানপাট বন্ধ ছিল। তবে প্রতিদিন সকালে কয়েকটি সুপার শপ এবং দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটার ট্রাক রাজাবাজারে এসেছে। সব পণ্য গায়ের দামে বিক্রি করা হলেও সবজি ও ফলের দাম বাজারমূল্যের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। আবার প্রয়োজনীয় সব পণ্য সব সময় পাওয়াও যায়নি।

৪. লকডাউন শুরুর আগের দিনেই রাজাবাজার থেকে প্রচুর মানুষ অন্য এলাকায়, অনেকে গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। কারণ তারা জানতেন ১৪ থেকে ২১ দিন তারা বাইরে বের হতে পারবেন না। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, যারা এলাকা ছেড়েছেন তাদের মধ্যে একটা বড় অংশই বেসরকারি চাকরিজীবী বা রাজাবাজারের বাইরে তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী লকডাউন এলাকায় সাধারণ ছুটি থাকলেও অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানই তাদের কর্মীদের এই সুযোগ দিতে চায় না। ফলে যারা অফিসে না গেলে অসুবিধায় পড়বেন বা ব্যবসার ক্ষতি হবে বলে শঙ্কা ছিল, তাদের অনেকেই এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় আত্মীয়-স্বজনের বাসায় গিয়ে উঠেছিলেন। ফলে লকডাউনের শেষদিন বিকেল থেকেই দেখা গেছে অনেক মানুষ পিঠে ব্যাগ নিয়ে এলাকায় ঢুকছেন।

কতজন জর্দা চেয়েছিলেন?

লকডাউন বাস্তবায়নে ১২০ জন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করেছেন, যারা স্থানীয় কাউন্সিলর ফরিদুর রহমান ইরানের কর্মী এবং স্থানীয় তরুণ। একটি হটলাইন নম্বর চালু ছিল। রাত-বিরেতে ফোন করলেও এসব স্বেচ্ছাসেবক মানুষের সেবায় এগিয়ে গেছেন। যদিও কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়ে বেশ হাস্যরস এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনাও হয়েছে। কোনো কোনো গণমাধ্যমে সংবাদ আসে যে, এখানের লোকজন নাকি মধ্যরাতে স্বেচ্ছাসেবকদের ফোন করে হাকিমপুরি জর্দা, চিপস, ফেয়ার এন্ড লাভলি ইত্যাদি চেয়েছেন। এটা নিয়ে ফেসবুকে বেশ ট্রলও হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো মধ্যরাতে স্বেচ্ছাসেবকদের ফোন করে জর্দা, ক্রিম, মুরগি বা চিপস আসলে কতজন চেয়েছেন? কতজন স্বেচ্ছাসেবক এরকম উদ্ভট দাবি বা আবদারের ফোন পেয়েছেন? মূলত কিছু লোক সব সময়ই অতি উৎসাহী এবং অতি কৌতূহলী। তারা ফাজলামো বা মানুষকে বিব্রত করার জন্যও এগুলো করেন। যেমন করোনার হটলাইন চালুর পর সেখানে অনেকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেছেন, আপা আপনি কেমন আছেন, কী করছেন, আপনার কি বিয়ে হয়েছে ইত্যাদি। এরকম কিছু লোককে পুলিশ আটকও করেছে। পরে এটা বন্ধ হয়েছে। তো সব সময়ই এরকম কিছু ফাউল লোক এসব ফাজলামো করে এবং এর সংখ্যা অতি নগণ্য। কিন্তু বিষয়টা নিয়ে মূলধারার কোনো সংবাদমাধ্যমও যেভাবে রিপোর্ট করেছে, সেখানে পেশাদারিত্ব ক্ষুণ্ন হয়েছে। আবার মানুষ যখন এসব রসালো বিষয়ে সাক্ষাৎকার দেয়, তখন অনেক সময় তারা সত্যের সাথে কিছু মিথ্যারও মিশেল ঘটায়। তাছাড়া মধ্যরাতে যেসব জিনিস রাজাবাজারের লোকজন চেয়েছেন এবং বাসায় পৌঁছে দিয়েছেন বলে স্বেচ্ছাসেবকরা দাবি করেছেন, রাত ১২টার পরে কি সেসব দোকান আদৌ খোলা ছিল? সুতরাং ইয়ার্কি করার জন্য বিচ্ছিন্নভাবে একটি দুটি ফোন কেউ করলেও সেটির পর্যাপ্ত অনুসন্ধান না করেই মূলধারার গণমাধ্যমে সংবাদ করা বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রল করা অনুচিত। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, যারা এসব ফোন করেছেন, তাদের অনেকে আদৌ রাজাবাজারের বাসিন্দা নন।

যা জানতে হবে:

১. লকডাউন বাস্তবায়নের কাজটি বেশ কঠিন ছিল। টানা ২১ দিন একটি এলাকায় চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং সবকিছু বন্ধ করে রেখে জীবন-যাপন স্বাভাবিক রাখা সহজ কথা নয়। আর এরকম একটি কঠিন কাজ করতে সরকারের নিশ্চয়ই অনেক টাকাও খরচ হয়েছে। এখন জানতে হবে, রাজাবাজারের লকডাউন বাস্তবায়নে সরকারের কত টাকা খরচ হয়েছে এবং কোন কোন খাতে ব্যয় হয়েছে?

২. শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক কি বিনা পারিশ্রমিকে দায়িত্ব পালন করেছেন নাকি তাদের সম্মানি দেয়া হয়েছে? যদি সম্মানি দেয়া হয় তাহলে সেই টাকার পরিমাণ কত?

৩. লকডাউনের তিন সপ্তাহে রাজাবাজারের স্থানীয় দোকানগুলো বন্ধ থাকায় তাদের কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে এবং সেই ক্ষতি কীভাবে পোষানো হয়েছে বা হবে? সরকার কি এই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের কোনো আর্থিক সহায়তা দিয়েছে? যদি দিয়ে থাকে তাহলে তার পরিমাণ কত?

৪. সব দোকানপাট বন্ধ থাকলেও প্রতিদিন সকালে সুপার শপের যে ট্রাকগুলো পণ্য নিয়ে আসতো, তারা এই তিন সপ্তাহে কত লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছে?

৫. লকডাউনভুক্ত এলাকার কর্মহীন ও দিনমজুরদের তালিকা করা হয়েছিল। এই ২১দিনে সেই মানুষদের কতজন খাদ্য সহায়তা পেয়েছেন এবং তাদের কী পরিমাণ সহায়তা দেয়া হয়েছে? খাদ্য সহায়তার ভেতরে কী কী ছিল?

৬. লকডাউন বাস্তবায়নে স্থানীয় মানুষদের সহায়তা, স্বেচ্ছাসেবকদের সম্মানিসহ অন্যান্য খাতে সরকারের সর্বমোট কত টাকা খরচ হয়েছে? এই হিসাবটা এ কারণে জানা দরকার যে, অন্যান্য যেসব এলাকায় লকডাউন বাস্তবায়িত হবে, সেখানে কত টাকা খরচ হবে, তার একটা ধারণা পাওয়া যাবে।

৭. বলা হচ্ছে, লকডাউনের কারণে পূর্ব রাজাবাজার এলাকায় করোনার সংক্রমণ কমেছে। এটিই স্বাভাবিক। কারণ তিন সপ্তাহ একটি এলাকায় জনগণ ও যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় মানুষে মানুষে যোগাযোগ কম হয়েছে। কিন্তু লকডাউন শেষ হওয়ার পরে এই এলাকায় সংক্রমণ লকডাউনের আগের অবস্থায় ফিরে যায় কি না, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

কী অর্জন হলো?

১. পুরো ঢাকা শহর উন্মুক্ত রেখে পরীক্ষামূলকভাবে রাজাবাজারকে লকডাউন করা হলো। এতে এই এলাকায় লকডাউন চলাকালীন করোনার সংক্রমণ হয়তো কম হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য উন্মুক্ত এলাকায় তো করোনা ঠিকই ছড়িয়েছে। আবার লকডাউন শেষে তো রাজাবাজারের মানুষ অন্য এলাকায় যাচ্ছেন এবং অন্য এলাকার লোকও এখানে আসছেন। এখন কি আর তারা সংক্রমিত হবেন না?

২. এই লকডাউনকে বলা হয়েছে ‘পাইলট’ বা ‘পরীক্ষামূলক’। ধরা যাক এসএসসি পরীক্ষার জন্য সরকার ফেব্রুয়ারি মাসকে নির্ধারণ করলো। তো মার্চ মাসে কোনো শিক্ষার্থী গিয়ে যদি এসএসসি পরীক্ষা দিতে চায়, তার পরীক্ষা নেয়া হবে? এখন যে লকডাউন করা হলো, এটা তো করার দরকার ছিল এপ্রিল – মে মাসে। জুন মাসে এসে যে পরীক্ষা নেয়া হয়েছে, তার রেজাল্ট  শেষ পর্যন্ত কি হলো ?

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, রংধনু টেলিভিশন।